Voice of SYLHET | logo

১১ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৪শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং

কাতিব মিডিয়ায় কাষ্টমারের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ, আড়ালে কী?

প্রকাশিত : November 15, 2019, 16:26

কাতিব মিডিয়ায় কাষ্টমারের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ, আড়ালে কী?

 

জুনায়েদ আহমদ:

সিলেট শহরের খ্যাতনামা ডিজাইন হাউজ কাতিব মিডিয়া। বিশেষত সিলেট অঞ্চলের ধর্মীয় ঘরানায় এর জনপ্রিয়তা একসময় তুঙ্গে ছিল। মাহফিল, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—ধর্মীয় ঘরানার যেকোনো প্রোগ্রামের প্রচারণার কাজ একসময় সকলেই এখান থেকে করাতেন। এর কারণ মূলত দুইটা। এক. কাতিব মিডিয়ার কাজের মান। দুই. কাতিব মিডিয়ার সত্ত্বাধিকারীর পরিচয়।

কাতিব মিডিয়া যে সমস্ত ডিজাইনের কাজ করত, তা ধর্মীয় ঘরানার সকলেরই মনঃপুত হতো। এ ছাড়া এর কর্ণধার ইনাম বিন সিদ্দীক আঞ্জুমানে তালিমুল কুরআন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও দেশ বিখ্যাত কারী হজরত আলী আকবর সিদ্দীক ভানুগাছী রহ.-এর ছেলে হবার কারণে সকলেরই বাড়তি একটা আগ্রহ ছিল কাতিব মিডিয়ার প্রতি। ফলে সেই ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে ইনাম বিন সিদ্দিক যখন প্রিন্ট ও ডিজাইনের ব্যবসা শুরু করেন, তখন থেকেই তিনি পিতার পরিচয়ের সুবাদে ধর্মীয় অঙ্গনের মনযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি একচেটিয়াভাবে ধর্মীয় ঘরানার মাহফিল সেমিনারের পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার, ফেস্টুন, বিভিন্ন স্মারকগ্রন্থ, ক্যালেন্ডার ইত্যাদির কাজ করে আসছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছে, তিনি তাঁর ক্লায়েন্ট বা গ্রাহকদের সঙ্গে ভালো আচরণ করছেন না। কাজও আগের মতো গোছিয়ে করেন না। কাজে অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে যায়, এ ব্যাপারে ক্লায়েন্টরা অভিযোগ করলে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন তিনি।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী ক্লায়েন্ট এ ব্যাপারে টাইম টিউনে মেইল করে অভিযোগ জানিয়েছেন। অনেকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে এসে দেখা যায়, তিনি এখন বেশ রূঢ় আচরণ করছেন তাঁদের সঙ্গে।

নামপরিচয় গোপন রাখার শর্তে সিলেটের একটি মাদরাসার দায়িত্বশীল এক ক্লায়েন্ট বলেন, কাতিব মিডিয়ায় আমরা নিয়মিত কাজ করাই। মাদরাসার মাহফিল প্রোগ্রাম ইত্যাদি অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত পোস্টার লিফলেট ব্যানার ফেস্টুন, মাদরাসার ক্যালেন্ডার সবই কাতিব থেকে করাই। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে কাতিবের কর্ণধার ইনাম বিন সিদ্দীকের আচরণ বেশ রূঢ় হয়ে গেছে। এর আগে তিনি বেশ নম্র ও ভালো আচরণ করতেন, ব্যবসায়ীরা কাষ্টমারের সাথে যেমনটা করে থাকেন, কিন্তু এখন যেন এসবের কোনো কেয়ার করেন না। কাজও আগের মতো সুন্দর করে করেন না।

তিনি বলেন, কাজের ক্ষেত্রে এখন তিনি অনেক ডিমান্ডও দেখান। পুরনো ও নিয়মিত কাষ্টমার হিসেবে যে মূল্যায়ন পাওয়ার কথা, সেটাও তিনি দেন না। বরং এমন মনোভাব দেখান, যেন তাঁর কাছে কাজ না করালেই কোনোকিছু যায় আসে না।

এ ব্যাপারে অবশ্য কাতিব মিডিয়ার বক্তব্য ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইনাম বিন সিদ্দীক নানা সময় অভিযোগ করে এসেছেন, প্রচুর কাষ্টমারের কাছে তাঁর বকেয়া পাওনা পড়ে আছে। এরা কাজ করায় ঠিকই, কিন্তু টাকা দেওয়ার সময় গড়িমসি করে। অনেক পরিচিত কাষ্টমারও পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে বাকিতে কাজ করিয়ে নেয়, পরে সময়মতো টাকা পরিশোধ করে না। অনেকে বছরের পর বছর ধরে টাকা আটকে রাখে। এসব দিক বিবেচনায় তিনি কাষ্টমারের সাথে টাকা-পয়সার ব্যাপারে ‘ক্লিয়ার-কাট’ কথা বলেন।

তবে অভিযোগকারী কাষ্টমাররা বলছেন, সবাই তো আর এমন করেন না। দু-একজনের অসততার দায়ে ঢালাওভাবে সব কাষ্টমারের সঙ্গে তাঁর এমন আচরণ উচিত নয়। তাঁর বাবা মাওলানা আলী আকবর সিদ্দীক রহ. সিলেটের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, উনার প্রতি সম্মান ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার খাতিরে তাঁর কাছে কাজ করাতে আসেন অনেকেই। যাদের মধ্যে সাত-পাঁচ না বোঝা গ্রাম্য অনেক সাধাসিধে আলেমও থাকেন।

এ ছাড়া কাতিব মিডিয়ায় বিভিন্ন কাজ করান এমন আরও বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, ইনাম বিন সিদ্দীক বড় একজন বুজুর্গের সন্তান এবং নিজেও একজন আলেম হওয়া সত্ত্বেও নামাজের পাবন্দি করেন না। প্রায় সময়ই তাঁরা কাজ করাতে গিয়ে দেখেছেন নামাজের সময়ে তাঁরা নামাজে গেলেও ইনাম বিন সিদ্দীক আপন কাজেই বসে থাকেন। এক ওয়াক্তের পর আরেক ওয়াক্ত আসে, সেদিকে তিনি ভ্রুক্ষেপই করেন না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইনাম বিন সিদ্দীক একসময় ডিজাইন ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বর্তমানে তিনি ইউটিউবিংয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। কাতিব মিডিয়াসহ একাধিক ইউটিউব চ্যানেলের মালিক তিনি। ডিজাইন ব্যবসার চেয়ে ইউটিউব থেকে ইনকাম করার দিকেই বেশি মনযোগ দিয়েছেন। আর এর সুবাদে ইসলাম-বহির্ভূত বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে তিনি সখ্যতা গড়ে তুলেছেন।

সিলেট থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তরুণ একাধিক আলেম টাইম টিউনকে বলেন, ইউটিউবের দিকে বেশি মনযোগী হবার কারণেই মূলত ডিজাইন ব্যবসা নিয়ে তিনি এতো ভাবছেন না। ডিজাইন ব্যবসার চেয়ে ইউটিউব থেকে অনেক বেশি আয় করছেন। ফলে কাষ্টমারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখারও খুব গরজ দেখাচ্ছেন না।

ইউটিউব ভিত্তিক যে ভিডিওগুলো তিনি বানান, সেখানেও কোনো কোনো ভিডিও নিয়ে সমালোচনা হতে দেখা গেছে। আঞ্জুমান কমপ্লেক্স মসজিদের ভেতরে একটা অনুষ্ঠানের ভিডিও ধারণের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে তাঁরা বলছেন, মসজিদের ভেতর এভাবে ভিডিও করা নিতান্ত দৃষ্টিকটূ এবং মসজিদের আদবের খেলাপ কাজ মনে হয়েছে তাঁদের কাছে।

ইসলামি চেতনা ও আদর্শের সঙ্গে বেমানান অনেক ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা সম্পর্কে তাঁরা বলেন, ওইসব ইউটিউব চ্যানেল থেকে বিভিন্ন ধরনের নাটক তৈরি হয়। তিনি ওসবে নিয়মিত উৎসাহ দেন এবং তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শরিক থাকেন। এমনকি তাঁর নিজের ইউটিউব চ্যানেল থেকেও সেসব চ্যানেল ও চ্যানেলে প্রচারিত নাটকের ব্যাপারে উৎসাহমূলক ভিডিও আপলোড দেন। যা খুবই দুঃখজনক। কারণ, তিনি সিলেটের সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন বুজুর্গের সন্তান। তাঁর পক্ষে ইসলামি চেতনা বহির্ভূত কাজের ব্যাপারে উৎসাহপ্রদান খুবই বেমানান ও হতাশাজনক। তাছাড়া তিনি যে ইউটিউবকে নিজের উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন, সেখানেও তো অনেক প্রশ্ন আছে। তিনি যেভাবে ঢালাওভাবে ইউটিউবিং করছেন, এখান থেকে আহরিত অর্থ কতটা হালাল?

ইউটিউব থেকে ইনকামের টাকা কতটা হালাল এবং শরিয়াহ সম্মত তা জানতে চেয়ে টাইমটিউন থেকে কথা হয়েছিল তরুণ মুফতী মাওলানা লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, মুফতী উমায়ের কোব্বাদী নকশবন্দী এবং মুফতী খালেদ আহমদের সঙ্গে। তাঁরা প্রত্যেকেই মোটামুটি একই বক্তব্য দিয়েছেন।

তাঁরা বলছেন, অনলাইনে আয়ের হাজার হাজার পদ্ধতির মধ্যে ইউটিউব থেকে আয় একটি জনপ্রিয় উপায়। বর্তমানে তরুণ সমাজের আয়ের অন্যতম মাধ্যম এটি। স্বাভাবিকতই প্রশ্ন ওঠে এই আয়ের টাকা কতটা হালাল?

জেনে রাখা জরুরি, গুগলের একটি বিশেষ সার্ভিস–গুগল এডসেন্স। এর মাধ্যমে গুগল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন অর্থের বিনিময়ে ইউটিউবসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সম্প্রচার করে। আর ওখান থেকে নির্ধারিত একটা অংশ তারা ইউটিউবারদের দিয়ে থাকে। সুতরাং বিজ্ঞাপনগুলো যদি অশ্লীল ও হারাম পণ্যের হয়, তাহলে তা থেকে প্রাপ্ত অর্থ হালাল হবে না। বরং, তা হারাম অর্থ হওয়ার পাশাপাশি হারামের প্রচার ও সহযোগিতা করার গোনাহ অর্থগ্রহণকারী ইউটিউবারকে বহন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, নিশ্চয়ই তাদের জন্য ইহকালে ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’। (সুর নূর, আয়াত : ১৯) এ ছাড়াও অসংখ্য হাদীসে রয়েছে এ ব্যাপারে।

পক্ষান্তরে ‘এডসেন্স’-এ সেনসিটিভ অপশনের মাধ্যমে যদি কেউ অশ্লীল ও হারাম পণ্যের এড বন্ধ রেখে অনৈসলামিক-বিজ্ঞাপনগুলো উপেক্ষা করা যায়, তাহলে তা থেকে প্রাপ্ত অর্থ হালাল হবে।

কিন্তু ইউটিউব এডসেন্স প্রক্রিয়াগতভাবেই সম্পূর্ণ হারাম। কারণ ইউটিউবে যে অ্যাডগুলো আসে তার ৫০%-এরও বেশি অ্যাড খারাপ থাকে, চাইলেও সে অ্যাডগুলোকে ব্লক করা যায় না, কিছু অবশ্যি ব্লক করা যায়, কিন্তু সম্পূর্ণ পারা যায় না। তাই এই ইনকাম হালাল হবার কোনো সুরত নেই।

এ বিষয়ে টাইম টিউন থেকে ইনাম বিন সিদ্দীকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

সূত্রঃঃ টাইম টিউন

সংবাদটি শেয়ার করুন

সংবাদটি পড়া হয়েছে 220 বার

যোগাযোগ

অফিসঃ-

উদ্যম-৬, লামাবাজার, সিলেট,

ফোনঃ 01727765557

voiceofsylhet19@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

সম্পাদক মন্ডলি

ভয়েস অফ সিলেট ডটকম কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।