Voice of SYLHET | logo

২০শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা জুলাই, ২০২২ ইং

মেজর সিনহা হত্যা: সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলো কেন?

প্রকাশিত : August 22, 2020, 20:27

মেজর সিনহা হত্যা: সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলো কেন?

নিউজ ডেস্কঃ-

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হবার পর থেকে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর দিক থেকে যেসব তৎপরতা দেখা যাচ্ছে সেটি নজিরবিহীন।

এই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা এবং সাক্ষীদের নিয়ে টানাটানি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই’র রিপোর্ট গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া – এ সবকিছু বেশ অস্বাভাবিক।

এই ঘটনার জন্য পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে দু:খ প্রকাশ করার পরেও পুলিশের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত মেজর সিনহার অন্যতম সহযোগী শিপ্রা দেবনাথের ব্যক্তিগত ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে হেনস্থার চেষ্টা করা হয়েছে।

অনেকে মনে করেন, এর মাধ্যমে পুলিশও হয়তো পরোক্ষভাবে পাল্টা জবাব দিতে চাইছে।

এসব ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়, মেজর সিনহা রাশেদ নিহতের ঘটনায় সেনাবাহিনী এবং পুলিশের মধ্যে এক ধরণের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

এই ঘটনার পর পুলিশের তরফ থেকে মেজর সিনহা এবং তার সহযোগীদের উপর দায় চাপিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এরপর মেজর সিনহার বোনের দায়ের করা মামলায় টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারসহ নয়জন পুলিশ সদস্যকে কারাগারে যেতে হয়েছে।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা যেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সেটি বেশ নজিরবিহীন।

কেন এই পরিস্থিতি?

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে কতটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় উভয়ের বেশ কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে।

সিনহা ও তার সহযোগীদের দায়ী করে করে পুলিশ যে মামলা দায়ের করেছে, সে মামলার সাক্ষীদের আটক করছে র‍্যাব।

অন্যদিকে মেজর সিনহার বোনের দায়ের করা মামলায় যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের পুলিশ হয়রানি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সেনাবাহিনীর বর্তমান এবং সাবেক অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, পুলিশের লাগাম টেনে ধরতে হবে।

অন্যদিকে পুলিশের কিছু কর্মকর্তার দিক থেকেও পাল্টা কয়েকটি কাজ করা হয়েছে যেগুলোকে দুই বাহিনীর মধ্যে দূরত্বের বহি:প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সিফাতের মুক্তির দাবিতে বরগুনার বামনা উপজেলায় যখন মানব বন্ধন করা হয়েছিল পুলিশের লাঠিপেটায় সেটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

এছাড়া নিহত সিনহার অন্যতম সহযোগী শিপ্রা দেবনাথের কিছু ব্যক্তিগত ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছেন পুলিশের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

অনেকে মনে করেন, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে সেটি শুধু সিনহা হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়। এই ঘটনা একটি অনুষঙ্গ মাত্র।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ঘটনা এতদূর কেন এল

“রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়, লোকাল রাজনীতি বলেন বা ন্যাশনাল রাজনীতি বলেন, পুলিশের যে ভাব তৈরি হয়েছে, এটার সাথে বাহিনীর ভেতরে এক ধরণের গরিমা এসেছে। নিয়ে এক ধরণের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না আমি বলবো যে এক ধরণের কোথাও কোথাও একটা মানসিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে,” বলছিলেন ব্রিগেডিয়ার হোসেন।

সেনা ও পুলিশ প্রধান এরই মধ্যে সিনহা হত্যার বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসিন মনে করেন, এখানে দুই বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছেন না একই সাথে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়।

“যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে,আমরা পত্রপত্রিকার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি যে তাদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো কিলিংস-এর (হত্যাকাণ্ডের) অভিযোগ আছে। ওই রিজিওনটাতে পুলিশের এক ধরণের ক্ষমতা আছে,” বলেন আমেনা মহসিন

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, শুধু মেজর সিনহা নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই যে দুই বাহিনীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা নয়। এর একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে।

আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের অধ্যাপক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাইদ ইফতেখার আহমেদ মনে করেন, মূল বিষয়টি হচ্ছে গণতন্ত্রের সংকট।

একটি দেশে গণতন্ত্র যত দুর্বল হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ততটা দুর্বল হতে থাকে, বলছেন তিনি।

অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে উঠে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এক্ষেত্রে কে কার চেয়ে শক্তিশালী সেটি প্রতিষ্ঠিত করার এক ধরণের চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশে সেটাই হয়েছে বলে মনে করেন মি. আহমেদ।

“যখন একটি রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্র মুখ্য হয়ে উঠে তখন কম্পিটিশনটা হয় বিভিন্ন আমলা গোষ্ঠীর মধ্যে। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নেই, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্গান মনে করে আমরাই এখানে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারি,” বলছিলেন সাইদ ইফতেখার আহমেদ।

“প্রত্যেকটা গোষ্ঠী চেষ্টা করে তাদের প্রাধান্য বজায় রাখার। ফলে একটা কম্পিটিশন তৈরি হয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীর মধ্যে।”

সেনা ও পুলিশ প্রধান কক্সবাজার পরিদর্শন করে এরই মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

কিন্ত তারপরেও সেনাবাহিনীর বর্তমান এবং সাবেক কর্মকর্তারা সেটি মানতে নারাজ। তাদের ধারণা এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব প্রদর্শন?

কক্সবাজার থেকে পাঠানো ডিজিএফআইর’র যে গোপন রিপোর্ট সংবাদ মাধ্যমে ফাঁস করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রতি পুলিশ সদস্যদের অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার এম. সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, দুই বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। তবে এক ধরণের চাপা উত্তেজনার বিষয়টি অস্বীকার করা যাবে না।

অনেকে মনে করেন, পুলিশের প্রতি সেনাবাহিনীর মনোভাব ইতিবাচক নয়।

কার ক্ষমতা বেশি? এনিয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে কোন প্রতিযোগিতা চলছে কি না?

এমন প্রশ্নে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত বলেন, “সুপ্রিমেসির কোন ব্যাপার থাকার কথা নয়। পুলিশ ফোর্স তার একটি আলাদা ম্যান্ডেট। সেনাবাহিনী তার একটা আলাদা ম্যান্টেড। পৃথিবীর প্রত্যেক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী সিনিয়রিটি ও প্রটোকলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ জনগণের বাহিনী, এটা একটা সার্ভিস সেক্টর। কাজেই এখানে সু্প্রিমেসির কোন বিষয় আমি এখানে মনে করিনা।”

তবে গত ২০-৩০ বছর অনেক জায়গায় বিভিন্ন আঙ্গিকে পুলিশ সেনাবাহিনীর সমকক্ষ হবার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত।

“যেমন ধরুন – পতাকা, স্টার, কে সিনিয়র কে জুনিয়র, কে ফোর স্টার, কে থ্রি স্টার – এগুলো কিন্তু আগে ছিলনা। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেও ছিল না। যখনই এগুলো শুরু হলো সেনাবাহিনীর আদলে, তখন থেকেই একটা মানসিক বিষয় হতে পারে। হতে পারে। আমি আবারও বলছি, অনুমান ভিত্তিক হতে পারে।

সৌজন্যেঃঃ বিবিসি

সংবাদটি শেয়ার করুন

সংবাদটি পড়া হয়েছে 168 বার

যোগাযোগ

অফিসঃ-

উদ্যম-৬, লামাবাজার, সিলেট,

ফোনঃ 01727765557

voiceofsylhet19@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

সম্পাদক মন্ডলি

ভয়েস অফ সিলেট ডটকম কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।