Voice of SYLHET | logo

৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ | ২১শে মে, ২০২২ ইং

মুরালি; এক ভয়ংকর সুন্দর

প্রকাশিত : April 17, 2020, 19:13

মুরালি; এক ভয়ংকর সুন্দর

শেখ রিদওয়ান হোসাইন:-

কিছু ক্রিকেটার আছেন যাদের পরিসংখ্যানে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। তাদের ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে রয়েছে রঙিন সব রেকর্ড যা ক্রিকেটের ইতিহাসকে করে দিয়েছে আরোও উজ্জ্বল।

ঠিক তেমনই একজন ক্রিকেটের নক্ষত্র হলেন মুত্তিয়া মুরালিধরন। যার নাম শুনলেই প্রথমে মনে আসে তার বড় বড় চোখ। যেই চোখেই ধরাশায়ী হয়েছে বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যান।নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারে তিনি তার শেষ বলে উইকেট নিয়েই শেষ করেন; আর সেটি মোটেও সাধারণ কিছু নয়! এটি ছিলো ৮০০ তম টেস্ট উইকেট যা বোলারদের জন্য শুধু স্বপ্নই বটে!

উইজডেনের সর্বকালের সেরা টেস্ট বোলার হিসেবে তিনি আখ্যায়িত হোন ২০০২ সালে। আইসিসির হল অব ফ্যাইমে একমাত্র শ্রীলঙ্কান হিসেবে জায়গা পাওয়া ক্রিকেটার হলে মুরালিধরন, ২০১৭ তে। আর তিনি যে শুধু টেস্টই সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিক তা নয়! ওয়ানডেতে তার উইকেট সংখ্যা ৫৩৪ টি যা এখনো পর্যন্ত সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের সংখ্যা একক বোলার হিসেবে।

১৯৭২ সালে শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডির ডোমিনিয়ন অব সিলনে তামিল হিন্দু পরিবারে এই কিংবদন্তির জন্ম।পিতা সিন্নস্যামি মুত্তিয়া ও মাতা লাকসমীর চার সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় সন্তানই হচ্ছেন তিনি। বাবা ছিলেন একজন সফল বিস্কুট ব্যাবসায়ীদের একজন। কে জানতো সেই পরিবারেই তৈরি হয়ে যাবে একজন বিশ্ববিখ্যাত বোলার যার দখলে থাকবে রেকর্ডের ফোয়ারা।

মুরালির বয়স যখন মাত্র ৯ বছর,তখন ক্যান্ডির এসটি এন্থোনি কলেজে পড়তেন যেটি ছিলো একটি প্রাইভেট স্কুল। সেখানেই তিনি ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করেন একজন মিডিয়াম পেস বোলার হিসেবে। তবে তৎকালীন স্কুলের কোচ সুনীল ফার্নান্দের পরামর্শে তিনি হয়ে উঠেন একজন অফ-স্পিনার,তখন তার বয়স ছিলো ১৪ বছর। তখন থেকেই স্পিন জাদু শুরু হয় আর জায়গা হয়ে যায় স্কুলের প্রধান একাদশে। একজন অলরাউন্ডারের ভূমিকাই পালন করতেন তখন। এসটি এন্থোনি কলেজের হয়ে ফাইনাল দুই সিজনে তিনি তুলে নেন ১০০ উইকেট যার ফলপ্রসূতে ‘বাটা স্কুলবয় ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার’ ঘোষিত হোন।

১৯৯১ সালে শ্রীলঙ্কা এ দলের হয়ে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার সুযোগ পান। তারপর এ্যালেন বোর্ডারস অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে বল করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন আর জায়গা পেয়ে যান শ্রীলঙ্কার টেস্ট দলে। সেখান থেকেই তার সর্বকালের সেরা টেস্ট বোলার হওয়ার যাত্রা শুরু।

ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম কব্জির উপর বল ঘুরানোর রেকর্ড মুত্তিয়া মুরালিধরনের। তার এই একক অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জন্য ব্যাটসম্যানকে পড়তে হতো হেনস্তায়। বল হাতে দুসরা,টপ স্পিনে শুরু থেকেই দারুণ পারদর্শী ছিলেন তিনি।অভিষেক টেস্টে ১৪১ রানের বিনিময়ে তুলেছিলেন ৩ উইকেট। তার প্রথম উইকেটটি ছিলো ক্রেইগ ম্যাকডেরমটের। টম মুডির স্টাম্পও স্থানচ্যুত করে দিয়েছিলেন সেই টেস্টে।

১৯৯২-৯৩ এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়লাভ করে যেখানে অন্যতম মূখ্য ভূমিকা পালন করেন মুরালি। নিজেকে ধীরে ধীরে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে থাকলেন। ক্যাপ্টেন রানাতুঙ্গাও মুরালির ব্যবহার করে যাচ্ছিলেন সুনিপুণভাবে। মুরালির একই ইনিংসে প্রথম ৫ উইকেটের দেখা পান সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সালে। যেখানে ছিলো ক্যাপলার ওয়েসেলস,হেনসি ক্রোনজে ও জন্টি রোডসের মূল্যবান উইকেটও।

১৯৯৫ সালে মুরালি নিজেকে শ্রীলঙ্কার বাহিরেও প্রমান শুরু করতে শুরু করেন। প্রথমে নিউজিল্যাণ্ডের সবুজ পিচে তারপর পাকিস্তানের পেস বান্ধব উইকেটে। পাকিস্তানকে তাদের নিজেদের মাটিতেই টেস্টে ২-১ এ হারিয়ে দেয় শ্রীলঙ্কা যেখানে মুরালিধরনের ছিলো ১৯টি উইকেট।

সেই সালেই বক্সিং ডে টেস্টে ক্রিকেটের মক্কা খ্যাত মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মুরালিধরন ইলিগাল বল করার জন্য নো বলের সিগনাল পান। সেই ম্যাচের আম্পায়ার হেয়ার, মুরালিকে তার ৩ ওভারের মধ্যে ৭ বার নো বল কল দেন। সেই ম্যাচে লাঞ্চ টাইমের পরে তার চতুর্থ ওভারে তিনি দুই বার নো বলের ডাক পান আম্পায়ারের কাছ থেকে। আর তার পঞ্চম ওভারে দ্বিতীয়, চতুর্থ ও ৬ষ্ট বলে নো বলের ডাক দেন আম্পায়ার। তারপর ক্যাপ্টেন রানাতুঙ্গা মাঠে ছেড়ে চলে যান ৩.০৩ এ ম্যানেজমেন্টের কাছে থেকে পরামর্শ নিতে আর মাঠে ফিরেন ঠিক ৫ মিনিট পর।ওই ওভার শেষে রানাতুঙ্গা মুরালিকে সরিয়ে দেন যদিও ৩.৩০ এ আবারও এ্যাটাকে আনেন। তারপরে মুরালি আরোও ১২ ওভার করেন কোনো নো-বল ছাড়াই। আর ১৮-৩-৫৮-১ এ থেকে বোলিং ফিগার শেষ করেন।

তারপর অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝাটের পর মুরালির বোলিং এ্যাকশন বৈধ করা হয় আইসিসির দ্বারা। তাকে বায়োক্যামিকেল পর্যালোচনা করা হয় ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ও হংকং ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স ও ট্যাকনলোজির মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালে যেখানে তার এ্যাকশনকে ‘অপটিকাল ইলুসন অব থ্রোয়িং’ বলে সমাপ্ত করা হয়।

১৯৯৭ সালের ১৬ মার্চ প্রথম শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার হিসেবে তিনি টেস্টে ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন। তার ১০০ তম টেস্ট শিকারটি ছিলো আরেক কিংবদন্তির স্টিফেন ফ্লেমিং এর উইকেট।

১৯৯৮ সালের জুলাইতে প্রথম ১০ উইকেটেরও দেখা পেয়ে যান জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ক্যান্ডির প্রথম টেস্টে। সেই টেস্টে শ্রীলঙ্কার ৮ উইকেটের বিশাল জয়ের পাশাপাশি মুরালি পান ১১৭ রান খরচায় ১২টি উইকেট।

সেই বছরই নিজের ক্যারিয়ার সেরা বোলিংটি করেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ২২০ রানের বিনিময়ে তিনি একাই তুলে নেন ১৬ টি উইকেট! সেই টেস্টে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে তো ৯ টি উইকেটই তুলে নেন মুরালিধরন৷ আর অন্যটি ছিলো রান-আউট। ব্যান হলিকে হয়ে যান তার ২০০ তম টেস্ট উইকেট শিকার।

বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম হিসেবে টেস্টে ৩০০ উইকেট তুলে নেন মুরালিধরন। ডারবানের প্রথম টেস্টে শন পোলককে সাজঘরে ফিরিয়ে এই মাইলিস্টোনের অংশীদার হোন মুরালি। এভাবেই ভাঙতে থাকেন অসংখ্য সব দূরহ রেকর্ড আর হয়ে উঠেন ব্যাটসম্যানদের জন্য দুঃস্বপ্ন।

২০০৪ সালের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কোর্টনি ওয়ালশের ৫১৯ টি টেস্ট উইকেট পিছনে ফেলে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির মালিক হয়ে যান মুরালি। তবে তার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবদন্তি শেন ওয়ার্ন তাকেও ছাড়িয়ে তুলে নেন ৫৩২ টি উইকেট। তবে সেটিও টপকাতে বেশি সময় নেন নি মুরালি। আর ইন্ডিয়ার বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক বিদায়ী টেস্টে প্রজ্ঞান ওঝার উইকেটটি নিয়ে তার ৮০০ উইকেট পূর্ণ করেন। যেটি ছিলো সর্বশেষ করা বল টেস্ট ক্রিকেটে।

দেখে নেওয়া যাক তার ৮০০ টেস্ট উইকেট কোন দলের বিপক্ষে কতোটি –

অস্ট্রেলিয়া- ৫৯
বাংলাদেশ- ৮৯
ইংল্যান্ড – ১১২
ইন্ডিয়া – ১০৫
নিউজিল্যান্ড – ৮২
পাকিস্তান – ৮০
সাউথ আফ্রিকা- ১০৪
ওয়েস্ট ইন্ডিজ – ৮২
জিম্বাবুয়ে – ৮৭

সর্বমোট- ৮০০ উইকেট।

তার টেস্ট ক্যারিয়ার-

ম্যাচ – ১৩৩
উইকেট- ৮০০
গড়- ২২.৭২
৫ উইকেট- ৬৭ বার
১০ উইকেট – ২২ বার

টেস্টের রাজা মুরালির ওয়ানডেতেও রেকর্ডের অন্ত নেই। তার রেকর্ডবুকে অসংখ্য সব রেকর্ডের ছড়াছড়ি রয়েছে। ১২ আগস্ট ১৯৯৩ সালে ইন্ডিয়ার বিপক্ষে অভিষেক হয়। সেই ম্যাচে ৩৮ রান খরচায় তুলেছিলেন ১ টি উইকেট।

তবে ২০০০ সালে ২৭ অক্টোবরে সেই ইন্ডিয়ার বিপক্ষেই নিজের ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেন মুরালি। ৩০ রানের বিনিময়ে তুলে নিয়েছিলেন ইন্ডিয়ার ৭ ব্যাটসম্যানকে। এপ্রিল ২০০২ সালে মুরালি ক্যারিয়ার সেরা র্যাঙ্কিং অর্জন করেন ৯১৩ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে। এই রেটিং ছিলো যেকোনে স্পিনারের মধ্যে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ অর্জনকৃত রেটিং।

অসংখ্য রেকর্ড গড়া মুরালি অবসরে যান ২০১১ সালে বিশ্বকাপের পর পরই। ২০১০ সালেই তিনও এ ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন। তবে বিদায়টা টেস্টের মতো রঙিন হয় নি। নিজের দল বিশ্বকাপের ফাইনালে হারে আর তিনি থাকেন উইকেট শূন্য। তবুও উনার শ্রেষ্ঠত্ব তো আর এক ম্যাচেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

মুরালিধরন টেস্ট ও ওডিআইয়ের সর্বোচ্চ উইকেটের পাশাপাশি কম্বাইনড সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক উইকেট শিকারের মালিকও,১৩৪৭ উইকেট! এছাড়াও সর্বোচ্চ ৫ উইকেট ও ১০ উইকেট তুলার একক মালিকও তিনি। তিনি ১০ উইকেট তুলতে পেরেছেন সবকটি টেস্ট ন্যাশনস দলের বিরুদ্ধেই।

টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ম্যান অব দ্য সিরিজ (১১বার) তার দখলে। মোদ্দাকথা,বোলিংয়ে বড় বড় সব রেকর্ডই এই একজনের পকেটে।

সেই বিস্ময় বোলারের আজ জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন ক্রিকেটের ব্লাক ডায়মন্ড মুত্তিয়া মুরালিধরন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সংবাদটি পড়া হয়েছে 326 বার

যোগাযোগ

অফিসঃ-

উদ্যম-৬, লামাবাজার, সিলেট,

ফোনঃ 01727765557

voiceofsylhet19@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

সম্পাদক মন্ডলি

ভয়েস অফ সিলেট ডটকম কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।