Voice of SYLHET | logo

১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৩১শে মে, ২০২০ ইং

মা যখন সন্তানের সেবিকা, তখন এ যত্নের শেষ কোথায়!

প্রকাশিত : মে ২২, ২০২০, ২০:৩০

মা যখন সন্তানের সেবিকা, তখন এ যত্নের শেষ কোথায়!

 

টিপু সুলতান : দিনটি ছিল ১১ এপ্রিল শনিবার। আমার সেদিন ডিউটিতে অফডে ছিল। বেলা তখন সাড়ে ১১ টা বাজে। তখন আমি আমার বিছানায় ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো, মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি আব্বার মোবাইল থেকে ফোন অাসছে।
ফোন রিসিভ করে সালাম দিলাম। আব্বা কাঁপা স্বরে বলতেছেন কিরে কি করিছ তুই। তখন উত্তরে বললাম কি হয়েছে, কোনো সমস্যা? তখন আব্বা বললো তোর ভাইয়া মোটর সাইকেল এক্সিডেন্ট করছে। এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখে নাই, কি করতে হবে এখন। তখন অামি বললাম উইমেন্স মেডিকেল কলেজ নিয়ে অাসো। অামার বাসার দ্বারেই উইমেন্স মেডিকেল। অামি তাড়াতাড়ি মেডিকেল গিয়ে জানলাম যে ডাক্তাররা অাসে নাকি (তখন লকডাউনের প্রথম পর্যায় চলছিল)।
যাইহোক ঘন্টাখানিক পরে খালাতো ভাই এবং চাচাতো ভাই দুজনে মিলে এম্বুলেন্স করে মেডিকেল নিয়ে অাসলেন। গাড়িতে ভাইয়াকে দেখার পর হিমশিম খেয়ে গেলাম, তখন নিজেকে আরো শক্ত করে নিলাম। যা করার দ্রুতই করতে হবে। তারপর ইমার্জেন্সি বিভাগে নিয়ে ঢুকালাম। তখন খালাতো এবং চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে রোগীর হিস্টোরিটা জানলাম। তখনই অামিই বুঝতে পারলাম উনার শরীর কি অবস্থায় অাছে (যেহেতু অামি একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট)।
রোগীর এডমিশন নেওয়ার অাগে প্রথমে অামি সিটিস্ক্যান করতে নিয়ে গেলাম। অামার সিনিয়র সিটিস্ক্যানটি করলেন। সিটিস্ক্যানে বিষয়টি ধরা পড়ে, স্পষ্টকরে দেখা যাচ্ছিল যে ব্রেইনে অনেকটা জায়গা জুড়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। যেটাকে অামরা সহজে স্ট্রোক হিসেবে বুঝি।
এরপরে নিউরো সার্জারিতে ভর্তি করলাম। আব্বাকে ফোন দিয়ে বললাম যেহেতু ভর্তি করে নিয়েছি, আসার সময় আম্মাকে সাথে করে নিয়ে অসো। জানিনা অাম্মা এতক্ষণ কি অবস্থায় বাড়িতে রয়েছেন। এটা সত্য যে তখন মায়ের শুধু হৃদয়ে নয় পুরো শরীরে রক্তকরন হচ্ছিল। বিকালের দিকে আব্বা- আম্মা আসছিলেন সাথে ভাইয়ার কিছু বন্ধুরা অাসছিল। অামাকে প্রথমে দরজায় পেয়ে অাম্মা একটু শক্ত হয়ে বললেন কি (কিতা) খবর ভাইয়ার। শক্ত হয়ে এটা বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে অামি যাতে শক্ত থাকি। কিন্তু আম্মার চোখেতো পানি, এটা কি আর লুকানো যায়। রুমে ঢুকেই যখন ভাইয়াকে দেখলেন তখনতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ভাইয়া তখন প্রায় সেন্সলেস অবস্থায়, মুখ দিয়েও কথা বের হয়না। অাম্মার কান্না যখন ভাইয়ার কানে গেলো, তখন সেন্সলেস অবস্থায় একটু মাথা তুলে অাম্মা বললেও পরক্ষনেই অাবার সেন্সলেস হয়ে যান। ট্রিটমেন্ট চলছে। কেবিনে ২ টা বেড রয়েছে, ১ টা রোগীর জন্য অার অারেকটা অামাদের জন্য। রাত তখন প্রায় ১ টা বাজে অাম্মাকে বললাম একটু ঘুমাও। অাম্মা বললেন চোখে ঘুম নেই। অাসল সত্য এইটা যে কিছুক্ষন পরেপরে ক্ষত স্থানে মলম লাগানো অাবার কখন স্যালাইন শেষ হয় যায়, কখনো অাবার ঔষধের টাইম হয়ে যায় , কখন ছেলের অবস্থা কি হয়ে যায় এই গুলাই তখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অারেকটা বিষয় সেন্সলেস থাকার কারনে ভাইয়া সারারাত হাত পা জোরে জোরে নাড়াচাড়া করতো। যার কারনে মাঝে মধ্যে হাত- পা চেপে বসে থাকতেন, মাঝে মধ্যে হাত-পা বেধেও রাখতেন, মাঝেমধ্যে অাবার নামাজও পড়তেন অাম্মা। এভাবে সারারাত ভাইয়ার পাশে বসাছিলেন। ফজরের সময় দেখলাম অাম্মা কোনোরকম ভাইয়ার পাশে একটু জায়গা করে নিয়ে দেয়ালের সাথে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে অাসেন। সকালে খাবার নিয়ে অাসলে অাম্মার গলা দিয়ে র খবার যায়না। এভাবে ২ দিন পার হলো। দুইদিন পরে কিছুটা সেন্স অাসলো ভাইয়ার। তিনদিন পর ফিজিওথেরাপি দেওয়া শুরু হলো। তখন অাম্মা নিজেই যেন একজন ফিজিওথেরাপিস্ট হয়ে গেলেন। একবার দেখিয়ে দিলেই দিনে কয়েকবার ব্যায়াম গুলো করাতেন। পরে ভাইয়ার ব্রেইনের কিছুটা উন্নতি হলে বাড়িতে নিয়ে অাছি। এভাবে মেডিকেল ১১ দিন ভর্তি ছিলাম।
পরে বাড়িতে ফিজিওথেরাপি দেওয়া শুরু করলাম। থেরাপিস্ট এসে বাড়িতে থেরাপি দিত, বাদবাকি সব মায়ের উপর। তো একদিন উঠানে দাড়িয়ে ছিলাম, অাম্মা তখন উঠানে কাজ করছিলেন। এই সময় কেউ একজন ভাইয়াকে গোসল দিচ্ছে। তো উনি উনার মতোই ভালো করে ঘা ঘসে দিচ্ছিলেন। হঠাৎ অাম্মার চোখে বিষয়টা লাগলো। তখন তিনি উঠে গিয়ে, উঠানের কাজ ছেড়ে সাবান দিয়ে ভালো করে ছেলের ঘা ঘেসে দিচ্ছিলেন। মনে হচ্ছে যেন আজকেই শরীরের চামড়া সাদা হয়ে যাবে। বিষয়টা দেখে অামি মনে মনে হাসলাম আর চিন্তা করলাম যে মায়েরা এমনই হয় বুঝি।বাবা-মায়েরা একদম বিনা স্বার্থেই সন্তানদের এত কদর করে বুঝি । আল্লাহপাক্ আমাদের এতো বড় নিয়ামত দিয়েছেন যে তা একটু সময় উপলব্ধি করলেই বুঝা যায়। পরিশেষে বলি যে দুই দিনের এই দুনিয়া ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল মা-বাবা। মা-বাবার অাশির্বাদ নিয়ে বেঁচে থাকুক পৃথিবীর সকল সন্তান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সংবাদটি পড়া হয়েছে 174 বার

যোগাযোগ

অফিসঃ-

উদ্যম-৬, লামাবাজার, সিলেট,

ফোনঃ 01727765557

voiceofsylhet19@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

সম্পাদক মন্ডলি

ভয়েস অফ সিলেট ডটকম কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।

Design & Developed By : amdads.website